‘আমার চোখের পাতায় লেগে থাকে নিকোনো উঠোনে সারি সারি লক্ষ্মীর পা আমি যত দূরেই যাই।‘

সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মেয়েরা এসে জড়ো হয়। সাথীরা মিলে সব জল সইতে যাবে। সূর্য প্রণাম সেরে জল নিয়ে এসে এবার গোবরগোলা আর এলা মাটি দিয়ে নিকোনো হবে উঠোন। আজ ব্রত পালনের দিন। বিশুদ্ধিকরণের কাজ শেষ করে পুজোর সব সামগ্রী যোগাড় করে রাখার পর উঠোন আর ঘরদোর সেজে উঠবে নানান আলপনার ঠাটে। আতপ চালের গুঁড়ি গুলে তা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন নক্সা। চাল গুঁড়ি দিয়ে বানানো পিটুলি লেপে এই আলপনার রঙ হয় সবসময়ই সাদা, যেন পবিত্রতার প্রতীক। তবে এই আলেপন শুধুমাত্র পুজোর স্থানকে সুন্দর করার জন্য নয়। এগুলির বিভিন্ন ঠাট বা মোটিফগুলিতে নিহিত আছে এক অনন্য সিম্বলিজম। প্রকৃতপক্ষে আলপনা যেন ব্রতকথাগুলির চিত্ররূপ। যে ব্রত উদযাপন হবে সেই ধারার ঠাট দিয়েই আঁকা হয় আলপনা। ‘খাঁটি মেয়েলি ব্রতগুলি ঠিক কোনো দেবতার পুজো নয়; এর মধ্যে ধর্মাচরণ কতক, কতক উৎসব, কতক চিত্রকলা নাট্যকলা গীতকলা ইত্যাদিতে মিলে একটুখানি কামনার প্রতিচ্ছবি, কামনার প্রতিধ্বনি, কামনার প্রতিক্রিয়া’। সেই প্রাগৈতিহাসিক গুহা চিত্রগুলিতে যেমন শিকারের সাফল্য কামনায় আঁকা হত নানা দৃশ্য এ যেন তারই আরেক প্রতিচ্ছবি। তাই আলপনা শুধু নক্সা নয় এর প্রতিটি রেখার টানে আছে ব্রতনির মনের নানান স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নপূরনের অগাধ বিশ্বাস। বিভিন্ন গোষ্ঠীভেদেও আলেপনের ধরন বদলে যায়। আর এই আলিম্পন রচনায় বিভিন্ন ঠাটের ভিন্ন ভিন্ন কাহিনিতে চোখ রেখেছেন, কান পেতেছেন, শিল্পী বিধান বিশ্বাস।

ছোটবেলা থেকেই ছবির প্রতি অনুরাগ। কৃষ্ণনগরের সৃজনময় পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা। কিশোর বিধানের মনে অনেক প্রশ্ন-ছবি কিভাবে আঁকে,কেনই বা আঁকে। প্রশ্নগুলো সহজ নয় আর উত্তরও জানা ছিল না। সেই উত্তরই খুঁজতে চিত্রশিল্পের অমোঘ টানে কলকাতা এসে ১৯৮০ তে ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া। তারপর পাঁচ বছর শিল্পকলা চর্চা। গ্রাম বাংলার খোলা অঙ্গনে বেড়ে ওঠা বিধানের ভাল লাগে না প্রথাগত অ্যাকাডেমিক শিক্ষা। আরও বিরক্তিকর লাগে কলকাতায় বারবার ভাড়া বাড়ি বদল। অর্থাভাব, স্থানাভাব, তো ছিলই কিন্তু শুধুমাত্র গ্যালারির চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ প্রদর্শনীতেও তাঁর মন সায় দেয় না। শুরু হয় নতুন কিছুর অনুসন্ধান। এরপর ২০০০ সালের বন্যায় কৃষ্ণনগরের বাড়ির অনেকটা ক্ষয়-ক্ষতি হয়ে যায়। কলকাতা ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন নিজের বাসভূমিতে। আবার ফিরে পান পৌষ মাসের শেষে সংক্রান্তি পালন, বাস্তু পুজো, কিংবা দুর্গা পুজোর পর কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর ব্রত উদযাপন। বিধানবাবুর মতে সব ঘরেই আলপনা দেয়, তবে পৌষ পার্বণের সময় আলপনার ভিন্নতা যেন বিভিন্ন গোষ্ঠী-চেতনার ফসল। “আমাদের গোষ্ঠীতে দেখেছি পৌষে বাস্তু পূজা আর সংক্রান্তি পালন করতে। সে এক অভিনব ব্যাপার বলে মনে হত। চারিদিকে যেন ধূম উঠে যেত। ঢেঁকিতে চাল কোটা, ধামার মুখে সাদা কাপড় বেঁধে তার উপরে রেখে চালের গুঁড়ি ছাঁকা। গুঁড়ি গোলা দিয়ে পিঠে বানানো। সেই পিঠে রাখা হচ্ছে বড় ধামায়, পিতলের গামলা আর হাঁড়িতে। নানারকম পিঠে তৈরি হত। সেই গুঁড়ি গোলা পিটুলি দিয়ে আবার আঁকা হত আলপনা। সব মিলিয়ে যৌথ পরিবারে হত মহোৎসব।“ গ্রাম্য যাপনে বার মাসে তেরো পার্বণ। আর এই নানান পার্বণে নানান ব্রত পালন। শহরেও যে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান যেমন- বর্ষবরণ, জন্মোৎসব বা লোকউৎসব পালনে আলপনায় সাজিয়ে তোলা হয়। সে আলপনায় কখনও থাকে মঙ্গল-প্রতীক, কখনও বা বিভিন্ন নান্দনিক নক্সার বুনন। তবে ব্রত অনুযায়ী যে নির্দিষ্ট আলপনা তার মধ্যে রয়েছে অন্য ভাষা। আর সেই ভাষার নেশাতেই পেয়ে বসলো বিধান বিশ্বাসের অনুসন্ধিৎসু শিল্পীমনকে।

ক্রমশঃ
ঋণ স্বীকার :
১. কবিতা ‘যত দূরেই যাই’ – সুভাষ মুখোপাধ্যায়
২. বাংলার ব্রত – অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩. মেয়েলি ব্রত ও কথা – শ্রী পরমেশপ্রসন্ন রায়
৪. বিধান বিশ্বাসের সাক্ষাৎকার
জীবনস্মৃতি আর্কাইভ ব্লগ
যুগ্ম সম্পাদক : অরিন্দম সাহা সরদার অবেক্ষক এবং সভাপতি, জীবনস্মৃতি আর্কাইভ ।
বিয়াস ঘোষ সম্পাদক, জীবনস্মৃতি আর্কাইভ ।
প্রধান সহযোগী সম্পাদক : মৌমিতা পাল
সহযোগী সম্পাদক মণ্ডলী : প্রমিতি রায় । অঙ্কুশ দাস । কুণাল গুপ্ত
প্রথম বর্ষ । প্রকাশ – ২ । ২২ জুন ২০২৫